আজকের পুঁজিবাজার:পুঁজিবাজারে বছরের পর বছর উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ, নিয়মিত লভ্যাংশ না দেওয়া, আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে ব্যর্থতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা লঙ্ঘন করেও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অবস্থায় রয়েছে বহু কোম্পানি। এতে বাজারে জল্পনাভিত্তিক লেনদেন ও কারসাজির সুযোগ বাড়ছে, ক্ষতির মুখে পড়ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এ পরিস্থিতিতে বন্ধ ও অকার্যকর কোম্পানির জন্য বাধ্যতামূলক তালিকাচ্যুতির (ডিলিস্টিং) বিধান চালু করতে চায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।
এ জন্য বিদ্যমান লিস্টিং রেগুলেশন সংশোধনের প্রস্তাব করেছে ডিএসই। সংস্থাটির পরিচালনা পর্ষদ ইতোমধ্যে প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছে। এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে পাঠানো হয়েছে।
বর্তমান লিস্টিং রেগুলেশন অনুযায়ী, টানা পাঁচ বছর কোনো লভ্যাংশ (নগদ বা স্টক) ঘোষণা না করা, টানা তিন বছর বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) না করা, স্বেচ্ছায় বা আদালতের আদেশে অবসায়নে যাওয়া, টানা তিন বছর বাণিজ্যিক উৎপাদন বা কার্যক্রম বন্ধ থাকা, তালিকাভুক্তি ফি বা অন্য কোনো পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়া এবং এই প্রবিধান বা অন্য কোনো সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করতে পারে।
তবে ডিএসইর মতে, বিদ্যমান বিধানে তালিকাচ্যুতি বাধ্যতামূলক নয়। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিবেচনার ওপর নির্ভর করে। এর সুযোগে বহু অকার্যকর কোম্পানি বছরের পর বছর মূল বোর্ডে থেকে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব কোম্পানির শেয়ারে অস্বাভাবিক মূল্য ওঠানামা ও জল্পনাভিত্তিক লেনদেনের মাধ্যমে বাজারে অস্থিরতাও তৈরি হচ্ছে।
এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে সময়সীমা নির্ধারণ করে বাধ্যতামূলক তালিকাচ্যুতির বিধান যুক্ত করতে চায় ডিএসই। তবে কোনো কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাচ্যুত করা হবে না। প্রথমে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। এরপর শুনানির সুযোগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তালিকাচ্যুতির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগও থাকবে।
সংশোধনী প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন জমা না দেওয়া, ঋণাত্মক নিট সম্পদ, ন্যূনতম ফ্রি-ফ্লোট শেয়ার বা মূলধনের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়া, প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা লঙ্ঘনের কারণেও কোনো কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করা যাবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন উৎপাদন বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও তালিকাচ্যুতির আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে কতদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকলে এ ব্যবস্থা কার্যকর হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ডিএসই বলছে, উৎপাদন বন্ধ হওয়ার কারণও বিবেচনায় নেওয়া হবে। গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ থাকলে এক ধরনের সিদ্ধান্ত হবে। আর স্পন্সর পরিচালক বা পরিচালনা পর্ষদের অনিয়ম কিংবা প্রতারণার কারণে প্রতিষ্ঠান অচল হলে তা ভিন্নভাবে বিবেচনা করা হবে।
তবে কোম্পানিগুলোর জন্য পুনরুদ্ধারের সুযোগও রাখা হচ্ছে। কোনো কোম্পানি যদি দুই বছরের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য পুনর্বাসন পরিকল্পনা (রিহ্যাবিলিটেশন প্ল্যান) উপস্থাপন করে এবং স্টক এক্সচেঞ্জের তত্ত্বাবধানে তা বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে বাধ্যতামূলক তালিকাচ্যুতি থেকে অব্যাহতি পেতে পারে।
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় নতুন বিধানও যুক্ত করতে চায় ডিএসই। প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি তালিকাচ্যুত হলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের শেয়ার স্পন্সর পরিচালকদের কিনে নেওয়ার (বাইব্যাক) বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ৩৬০। এর মধ্যে নিয়মিত লভ্যাংশ বিতরণ ও বার্ষিক সাধারণ সভা আয়োজনে ব্যর্থ হওয়ায় ১২৫টি কোম্পানি ‘জেড’ শ্রেণিতে রয়েছে, যা মোট তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রায় ৩৫ শতাংশ। পাশাপাশি বন্ধ ও অকার্যকর কোম্পানির তালিকায় রয়েছে ৩৩টি কোম্পানি, যা মোট তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রায় ৯ শতাংশ।
ডিএসইর বন্ধ কোম্পানির তালিকায় রয়েছে একটিভ ফাইন কেমিক্যালস, অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স, আরামিট সিমেন্ট, আজিজ পাইপস, বারাকা পাওয়ার, বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং, দুলামিয়া কটন, এমেরাল্ড অয়েল, ফ্যামিলিটেক্স (বিডি), জিবিবি পাওয়ার, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস, হামিদ ফেব্রিক্স, খুলনা পাওয়ার কোম্পানি, খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ, মেট্রো স্পিনিং মিলস, মিঠুন নিটিং, নিউ লাইন ক্লোথিংস, নর্দার্ন জুট, নূরানী ডাইং, প্যাসিফিক ডেনিমস, প্রাইম টেক্সটাইল, রহিমা ফুড, আরএসআরএম, রিজেন্ট টেক্সটাইল, সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ, রাষ্ট্রায়ত্ত শ্যামপুর সুগার মিলস, স্ট্যান্ডার্ড সিরামিকস, তুং হাই নিটিং, ইয়াকিন পলিমার, জাহিন স্পিনিং এবং রাষ্ট্রায়ত্ত উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরিজ।
এ ছাড়া ভবিষ্যতে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে আরও ৪৩টি কোম্পানি। বন্ধ কোম্পানিগুলো বাদে এ তালিকায় রয়েছে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, আনলিমায়ার্ন ডাইং, বাংলাদেশ সার্ভিসেস, বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স (বিআইএফসি), সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালস, ঢাকা ডাইং অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং, ডরিন পাওয়ার, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, গ্লোবাল হেভি কেমিক্যালস, জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ), ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইনটেক, জুট স্পিনার্স, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ, মেঘনা সিমেন্ট মিলস, ন্যাশনাল টি কোম্পানি, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, সাফকো স্পিনিং মিলস, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, সোনারগাঁও টেক্সটাইলস, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, তাল্লু স্পিনিং মিলস এবং জিল বাংলা সুগার মিলস।
ডিএসইর প্রস্তাব নিয়ে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, কমিশন ডিরেগুলেশনের দিকে যেতে চায়, যাতে স্টক এক্সচেঞ্জ স্বাধীনভাবে তার আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। এ জন্য ডিএসইর প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে কমিশন প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।
Leave a Reply