রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০১:০৮ অপরাহ্ন

সিএফও নিয়োগ নিয়ে আইডিআরএ’র সার্কুলার বাতিলের দাবি

সিএফও নিয়োগ নিয়ে আইডিআরএ’র সার্কুলার বাতিলের দাবি

আজকের পুঁজিবাজার: প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) নিয়োগসংক্রান্ত বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নতুন সার্কুলার নিয়ে বীমা খাতে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। এ ধরণের সিদ্ধান্ত খাত জুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হতে পারে উল্লেখ করে সার্কুলার বাতিলের দাবি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

গত ২৮ অক্টোবর সিএফও সংক্রান্ত নতুন নির্দেশনা দেয় আইডিআরএ। এতে বলা হয়, বীমা কোম্পানির সিএফও হতে হলে আবশ্যিকভাবে আইসিএবি বা আইসিএমএবি-এর ফেলো বা অ্যাসোসিয়েট সদস্য, ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলসের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস, যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডার সিপিএ, যুক্তরাজ্যের এসিসিএ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সিএফএ সনদসহ সুনির্দিষ্ট পেশাগত যোগ্যতা থাকতে হবে। নতুন যেকোনো নিয়োগের পূর্বে আইডিআরএর পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি, বিদ্যমান সিএফওদের মধ্যে যাদের এই যোগ্যতা রয়েছে তাদের আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে এবং যাদের এই যোগ্যতা নেই তাদের আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন যোগ্য সিএফও নিয়োগ করে অনুমোদন নিতে হবে।
তবে আইডিআরএর এই নির্দেশনার ফলে বীমা খাতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম নেতারাও এই সার্কুলারের ‘বৈধতা এবং বাস্তবায়ন’ নিয়ে সন্দিহান। অর্থবাংলা দুই সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, একাধিক বীমা প্রতিষ্ঠানের সিইও এবং সিএফওর সঙ্গে কথা বলেছে। ‘সেনসেটিভ ইস্যু’ উল্লেখ করে কেউ প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করে তাঁরা বলছেন, এ ধরণের সিদ্ধান্তে খাত জুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে সাংগঠনিকভাবে সিদ্ধান্তের কথা জানান তারাঁ। সার্কুলার ‘সংশোধন অথবা বাতিলের’ দাবিতে আইডিআরএর সঙ্গেও কথা বলবেন।
সিংহভাগ নির্বাহী ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, দেশে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা নির্ধারিত পেশাগত সনদধারী সিএফও’র তীব্র সংকট রয়েছে। মাত্র এক থেকে দুই মাসের এই স্বল্প সময়ের মধ্যে যোগ্য প্রার্থীর সন্ধান পাওয়া এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব। তাদের মতে, এই সার্কুলার বাস্তবতা মেনে করা হয়নি। এতে করে বেশি কোম্পানিকে সিএফও চাকুরীচ্যুত হবেন। ৮২ টি বীমার মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১২ জন কোয়ালিফাই করবে, বাকি সবাইকে হঠাৎ করে চাকুরীচ্যুতর সিদ্ধান্ত পুরোপুরি অযৌক্তিক। এছাড়া অনেক কোম্পানিতে দীর্ঘদিন ধরে ১০ থেকে ২০ বছর ধরে কর্মরত অভিজ্ঞ সিএফওদের এখন বাদ দিতে গেলে কোম্পানিগুলোকে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নতুন করে যোগ্য সিএফওদের চড়া বেতন দিতে হওয়ায় ছোট ও মাঝারি মানের বীমা কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একইসঙ্গে আইনগত এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। বীমা আইন ২০১০-এর বিভিন্ন ধারায় সিইও, উপদেষ্টা, এজেন্ট, ব্রোকার ও জরিপকারী নিয়োগের এখতিয়ার আইডিআরএকে দেওয়া হলেও সিএফও নিয়োগের ক্ষেত্রে সরাসরি নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন নির্দেশনা আইনকে পাশ কাটিয়ে দেওয়া হয়েছে কি না—তা নিয়ে বীমা খাতে জোরালো আলোচনা চলছে। সরকার ইতোমধ্যে বীমা আইন সংশোধন করে সিএফও ও কোম্পানি সচিব নিয়োগে অনুমোদন নেওয়ার প্রস্তাব করলেও খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার আগেই এই সার্কুলার জারি করায় খাতটিতে একধরনের অস্বস্তি ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
সিএফও নিয়োগের এই সার্কুলার নিয়ে দেশের লাইফ ও নন-লাইফ বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহীরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, যোগ্য সিএফও নিয়োগের উদ্যোগ ভালো হলেও এত অল্প সময়ের মধ্যে এমন যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি পাওয়া অত্যন্ত দুরূহ। অনেক কোম্পানিতে দীর্ঘ ১০-২০ বছর ধরে একই ব্যক্তি সিএফও হিসেবে কর্মরত আছেন, যাদের অভিজ্ঞতা ও অবদান মূল্যায়ন করে সময়সীমা বাড়ানো বা ছাড় দেওয়া উচিত। দেশে সিএ ডিগ্রিধারীর সংখ্যা কম থাকায় তাদের উচ্চ বেতনের কারণে ছোট ও মাঝারি কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে, তাই সময়সীমা বাড়িয়ে অন্তত ছয় মাস করা উচিত।
তাদের মতে, যোগ্যতাসম্পন্ন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা নির্দিষ্ট পেশাদার সনদধারী সিএফওদের তীব্র ঘাটতির বাজারে অল্প সময়ের মধ্যে এই কড়া যোগ্যতা অর্জন ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা অনেক কোম্পানির জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি নিয়োগে আইডিআরএর পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতার কারণে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা এবং দৈনন্দিন কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দেওয়ার শঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি, দক্ষ পেশাজীবীদের তীব্র প্রতিযোগিতা ও উচ্চ বেতনের কারণে বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি মানের বীমা কোম্পানিগুলো বড় ধরনের আর্থিক ও ব্যবস্থাপনা সংকটে পড়ার আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। হঠাৎ করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে বীমা সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন ছিল উল্লেখ করে সার্কুলার বাতিল করে নতুন করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবি জানান তারা।
একাধিক বীমা কোম্পানির সিএফও ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আইডিআরএর এই সিদ্ধান্তে তারা ক্ষুব্ধ এবং বিষয়টি নিয়ে ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন ও ইন্স্যুরেন্স ফোরামসহ আইডিআরএর সঙ্গে আলোচনা করবেন। প্রয়োজনে আন্দোলনের পাশাপাশি আদালতে যেতেও প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম নেতারাও এই সার্কুলারের ‘বৈধতা ও বাস্তবায়ন’ নিয়ে সন্দিহান। তাঁরা বলছেন, সার্কুলারে ভালো কিছু বিষয় রয়েছে। তবে  ‘সব ভালো’ একসঙ্গে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। কারণ, আমাদের কে বীমা খাতে বিদ্যমান পরিস্থিতি মেনেই কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এধরণের সিদ্ধান্তে খাত জুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে সাংগঠনিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতে পারে। এই সার্কুলার বীমা খাতের জন্য প্রয়োজন হলেও বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব ও সময়সাপেক্ষ। সার্কুলার সংশোধন অথবা বাতিলের দাবিতে আইডিআরএর সঙ্গেও কথা বলবেন।
এদের কেউবা ভিন্ন সুরেও কথা বলছেন। হঠাৎ এ ধরণের সিদ্ধান্ত আইডিআরএর চেয়ারম্যানকে বিব্রত কিংবা বির্তকিত করার জন্য কি-না, সেই সন্দেহ তাদের। কেউ কেউ বলছেন, চেয়ারম্যানের ভালো কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে আইডিআরএর ভেতর থেকে কোন মহল পুরো বীমা খাতকে পরিকল্পিত উস্কে দিচ্ছে কি-না, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা।
আইডিআরএর একাধিক কর্মকর্তা এই সার্কুলার জারি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, হঠাৎ করে সিএফওদের নিয়ে এতো বড় কঠোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কিছুটা কঠিন। বিষয়টি কে কিভাবে, কি চিন্তা থেকে করেছে, সেই আলোচনাও হতে পারে।
এ বিষয়ে আইডিআরএর অপর এক কর্মকর্তা বলেন, বীমা খাতে শিক্ষিত, যোগ্য ও দক্ষ লোকের তীব্র অভাব রয়েছে। তাদের অযোগ্যতার কারণে অনেক বীমা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বীমা খাতের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই সার্কুলার দেওয়া হয়েছে। তবে কারো কোনো আপত্তি থাকলে সে বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

?>
© All rights reserved © 2023 ajkerpujibazar.com
Design & Developed by BD IT HOST