রবিবার, ১৬ Jun ২০২৪, ০৮:৫৮ অপরাহ্ন

লোকসানি ক্রাফটসম্যানের যত ফাঁকিবাজী

লোকসানি ক্রাফটসম্যানের যত ফাঁকিবাজী

আজকের পুঁজিবাজার:বিনিয়োগকারীদের নতুন আতঙ্কের নাম ক্রাফটসম্যান। ক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাক্সেসরিজ লিমিটেড। বাধাবিহীন আসছে শেয়ার বাজারে। তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য যে সব প্রতিষ্ঠান ও কর্তার কাছে ফাইল যায় প্রায় সব টেবিল পার করেছে। নিষ্ঠার সঙ্গে সহযোগিতা করছে অডিটর, ইস্যু ম্যানেজার, প্লেসমেন্টধারী শেয়ারহোল্ডারগণ।

এজন্য ব্যবহার করা হয়েছে ওজনদার টেলিফোন…। ফলে পদে পদে ভুল তথ্য ও ফাঁকি দেয়া গোজামিলের আর্থিক প্রতিবেদনে চোখ বুলানোর দুঃসাহস দেখাচ্ছে না রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের কেউই।

প্রসপেক্টাস দেখলেই বোঝা যায়, কোম্পানিটি আর্থিক প্রতিবেদনে গোজামিল দিয়েছে। ক্রাফটসম্যান প্রকৃতপক্ষে কোনোভাবেই লাভে নেই। সবারই উচিত এ ধরনের বাজে কোম্পানিকে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্তিতে বাধা প্রদান করা।

অনুসন্ধানকালে দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন ক্রাফটসম্যানের ভয়াবহ ফাঁক-ফোকরের তথ্য। এমনও জানিয়েছেন, বাজারে আসতে এ শেয়ারের পথ রোধ করবে আপাতত এমন কাউকে দেখছি না। মোটামোটি সুবিধার ভেলায় উঠেছেন সবাই। নইলে অন্যরা যখন লোকসানের ভারে কারখানা বন্ধ করেছিল তখন এ কোম্পানিটির খাতায় লাভ আর লাভ। তবে শেষটা দেখা যাক…।

কোম্পানিটির প্রসপেক্টাস সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ অর্থ বছরে (২০২২-২৩) কোম্পানিটি ৭৩ কোটি ৪২ লাখ ৫৮ হাজার ৭০১ টাকার পণ্য রফতানি করেছে। এর বিপরীতে সরকারের কাছ থেকে ক্যাশ ইনসেনটিভ বাবদ কোম্পানিটির প্রাপ্তি দেখানো হয়েছে ৯ কোটি ৮০ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬০ টাকা। সে বছর মোট সেলের উপর ১০ শতাংশ হারে ক্যাশ ইনসেনটিভ দিয়েছে সরকার। সেক্ষেত্রে ক্যাশ ইনসেনটিভ দাঁড়ায় ৭ কোটি ৩৪ লাখ ২৫ হাজার ৮৭০ টাকা। এক্ষেত্রে কোম্পানিটি ক্যাশ ইনসেনটিভ বেশি দেখিয়েছে ২ কোটি ৪৬ লাখ ৩১ হাজার ৭৮৯ টাকা।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা বলছেন, এক্সপোর্ট অরিয়েন্টেড কোম্পানিগুলোকে ক্যাশ ইনসেনটিভে পেতে সমস্ত নথি ১৮০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ ৬ মাসের মধ্যে ব্যাংকে জমা দিতে হয়। এরপর ক্যাশ ইনসেনটিভ পেতে আরও ৬ মাস থেকে ১ বছর লেগে যায়। মোট টার্নওভারের উপর মোট ক্যাশ ইনসেনটিভ একবারে পাওয়ার সূযোগ নেই। কেস টু কেস ক্যাশ ইনসেনটিভ পেয়ে থাকে। বছরে যতবার রফতানি করবে অডিট হওয়ার পর ততবার ক্যাশ ইনসেনটিভ পেয়ে থাকে কোম্পানিগুলো। এক্ষেত্রে ক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যার যদি ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ৫ বার রফতানি করে থাকে, তবে ৫ বার বিভিন্ন তারিখে ক্যাশ ইনসেনটিভ পেয়েছে। এ পাঁচবার ক্যাশ ইনসেনটিভ পেতে দেড় থেকে ২ বছর লাগার কথা। সেক্ষেত্রে এক বছরেই মোট টার্নওভারের বিপরীতে ক্যাশ ইনসেনটিভের সব টাকা একবারে কোম্পানিটির হাতে আসা ‘অষ্টম আচার্য’।

প্রসপেক্টাসে মোট টার্নওভারের বিপরীতে মোট ক্যাশ ইনসেনটিভ দেখিয়েছে। তাও আবার ২ কোটি টাকা বেশি দেখিয়েছে। যদি ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের মধ্যে কোম্পানির পুরো টার্নওভার হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে উল্লেখিত অর্থবছরের মধ্যে সমস্ত ক্যাশ ইনসেনটিভ পেতে পারে। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, শুধু তিন মাস পণ্য রফতানি করেছে ক্রাফটসম্যান? বছরের বাকি ৯ মাস রফতানি করেনি? কোম্পানিটির উৎপাদন কি বন্ধ ছিল? এমন প্রশ্ন রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর ওই কর্মকর্তার।

ক্রাফটসম্যানের চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) ফেরদৌস হোসেন বলেন, ২০২২-২০২৩ অর্থবছর জুড়ে অস্বাভাবিক হারে রফতানির অর্ডার পেয়েছিল কোম্পানি। ফলে পুরো বছর জুড়েই পণ্য রফতানি করা হয়েছে।

এসএমই প্ল্যাটফর্মের আরেকটি এক্সপোর্ট অরিয়েন্টেড কোম্পানি এমকে ফুটওয়্যার পিএলসি। কোম্পানিটি ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ১২৬ কোটি ৮৮ লাখ ৪৪ হাজার ৮৭৭ টাকা টার্নওভার দেখিয়ে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। কিন্তু পরের বছরই (২০২২-২৩ অর্থবছর) টার্নওভার নেমে যায় ৪৪ কোটি ৪১ লাখ ৬৯ হাজার ৬১৮ টাকা। ততদিনে বাজার থেকে টার্গেট পরিমান টাকা তুলে নেয়া শেষ করে এ চামড়াশিল্প কারখানাটি।

নথিপত্র বলছে- এমকে ফুটওয়্যারের পথেই হাটছে ক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও ভয়াবহ অনিয়ম ধরা পড়েছে অনুসন্ধানে। বিশ্লেষকদের প্রশ্ন বাজারে তালিকাভুক্তির পর ক্রাফটসম্যানের টার্নওভার যে কমবে না, তার নিশ্চয়তা দিবে কে?

অন্যদিকে- একই শিল্পের একই ধরনের কোম্পানি এমকে ফুটওয়্যারের যেখানে টার্নওভার আকস্মিকভাবে কমে গেছে, সেখানে ক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যারের টার্নওভার একই সময়ে কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সময়টাও ছিল মহামন্দা করোনার দাপটের। দেশ-বিদেশের সব প্রতিষ্ঠানের আয় যখন কমেছে তখন আলোচ্য প্রতিষ্ঠানের আয়ে লাভের হাওয়া লাগে। যা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও সন্দিহান।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যারের দীর্ঘমেয়াদি লোন রয়েছে ৩৭ কোটি ৩৯ লাখ ৫৩ হাজার ৫৯১ টাকা। আর স্বল্পমেয়াদি লোন রয়েছে ১৯ কোটি ৪৬ লাখ ৮৩ হাজার ১৬৮ টাকা। মোট লোন ৫৬ কোটি ৮৬ লাখ ৩৬ হাজার ৭৫৯ টাকা। ১২ শতাংশ হারে ব্যাংক ইন্টারেস্ট আসে ৬ কোটি ৮২ লাখ ৩৬ হাজার ৪১১ টাকা। অথচ কোম্পানিটি ফাইন্যান্সিয়াল কষ্ট দেখিয়েছে ৪ কোটি ১০ লাখ ৬২ হাজার ৬৯১ টাকা। কোম্পানিটি ব্যাংক ইন্টারেস্ট কম দেখিয়েছে অন্তঃতপক্ষে ২ কোটি ৭১ লাখ ৭৩ হাজার ৭২০ টাকা। বিনিয়োগকারীদের টানতে লাভজনক দেখাতে অসত্যোর আশ্রয় নিয়েছে কোম্পানিটি।

এমডির বাসা যখন অফিস

ক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যরের প্রসপেকটাসে উল্লেখ করা হয়েছে তাদের অফিস রাজধানীর ১৪ নিউ ইস্কাটন, মগবাজার। কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায় ওই ভবনটিতে কোনো অফিসই নেই। আবাসিক ভবন। নিজ নিজ ফ্ল্যাটে মালিকরা। তবে সেখানে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাদাত হোসেন সেলিম বসবাস করেন পরিবার সদস্যদের নিয়ে। বিনিয়োগকারীদের সঠিক তথ্য দেয়নি কোম্পানিটি।

পানির দামে কলাবাগানে অফিস ভাড়া

কোম্পানিটির প্রসপেক্টাসে সর্বশেষ অর্থবছরে হেড অফিসের ভাড়া বাবদ ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয় দেখিয়েছে। সেক্ষেত্রে মাসে ভাড়া বাবদ খরচ হয় ৪০ হাজার টাকা। আর কর্পোরেট অফিসের বছরে ভাড়া ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তাদের হিসাবমতে কোম্পানিটির মাসে ভাড়া বাবদ খরচ হয় ২০ হাজার টাকা। কোম্পানিটির দুটি অফিসের একটি ধানমন্ডির লেক সার্কাসে এবং অপরটি মগবাজারে। তবে কোনটি হেড অফিস এবং কোনটি কর্পোরেট অফিস তা উল্লেখ করা হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর কলাবাগানের লেকসার্কাস অফিসটি আনুমানিক ২ হাজার স্কয়ার ফিটের। এখানকার প্রতি স্কয়ারফিটের ভাড়া কমপক্ষে ৪০ টাকা। ২ হাজার স্কয়ারফিটের মাসিকভাড়া আনুমানিক ৮০ হাজার টাকা হবে; যা একই বিল্ডিংয়ের একই ফ্লোরের বাসিন্দা একরাম হোসেন আপন দেশকে জানান। আর মগবাজারে এমডির বাসাকে অফিস হিসাবে চালালেও সেখানকার ভাড়া ৪০ হাজারের নিচে হবে না। এখানেও অফিস দুটির (!) মাসিক ভাড়া ৬০ হাজার টাকা কম দেখিয়েছে।

সাধারণত কোনো কোম্পানির টার্নওভার বাড়লে ফ্যাক্টরি ওভারহেডে রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স খরচ বাড়ে। কিন্তু ক্রাফটসম্যানের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো। অর্থাৎ রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনেটেন্যান্স খরচ কমেছে। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে কোম্পানিটির রিপায়ার অ্যান্ড মেইন্ট্যান্স বাবদ খরচ হয়েছে ৪ লাখ ৭২ হাজার ৬৭০ টাকা। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে যা দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৯৪০ টাকা। এখানে খরচ ১ লাখ ৩২ হাজার ৭৩০ টাকা কম দেখিয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ইস্যু ম্যানেজার গ্রীণ ডেল্টা ক্যাপিটালের ম্যানেজার মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, এ বিষয়টি সম্পর্কে আমি কিছু বলতে পারবো না। আমরা কোম্পানিটির বেসিক বিষয়গুলো দেখে ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছি। বাকি বিষয়গুলো অডিট কোম্পানি ( জি কিবরিয়া অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টস) ও ক্রাফটসম্যানের সিএফও জানেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাধারণত গার্মেন্টস বা অন্যান্য খাতের তুলনায় লেদার খাতে শ্রমিকদের মজুরি বেশি হয়ে থাকে। একজন গার্মেন্টস শ্রমিক ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার মজুরি পেয়ে থাকে। ক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যারের ফ্যাক্টরি ওভারহেডে সর্বশেষ অর্থবছরে শ্রমিকদের মজুরি বাবদ বছরে খরচ দেখানো হয়েছে ৭ কোটি ১৭ লাখ ৪১ হাজার ১৪৪ টাকা। কোম্পানিটিতে ৮২৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারিও শ্রমিক আছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে ৭৫০ জনকে শ্রমিক এবং মজুরি সর্বনিম্ন ১৫ হাজার টাকা ধরা হলেও বছরে মোট মজুরির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এখানে খরচ কম দেখিয়েছে ৬ কোটি ৩২ লাখ ৫৮ হাজার ৮৫৬ টাকা। কর্মকর্তাদের মধ্যে খোদ এমডি শাদাত হোসেন সেলিমই মাসে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা সম্মানী নেন।

 

 

এছাড়াও ফ্যাক্টরি ওভারহেডে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে কোম্পানিটির জেনারেটর ভাড়া, শ্রমিকদের টিফিন, ইন্সপেকশন এক্সপেনসেস, অগ্নি নির্বাপক বাবদ খরচসহ বিভিন্ন খরচ উল্লেখ করেনি। সঠিকভাবে আর্থিক প্রতিবেদন উঠে আসলে কোম্পানিটির অবশ্যই ‘লোকসানি প্রতিষ্ঠান’ হবে।

এ ধরনের কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্তির সুযোগ করে দেয়ায় বাজারের আজ নাজেহাল অবস্থা। ক্রাফটসম্যানের প্রসপেক্টাস দেখলেই বোঝা যায়, কোম্পানিটি আর্থিক প্রতিবেদনে গোজামিল দিয়েছে। সবারই উচিত এধরনের বাজে কোম্পানিকে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্তিতে বাধা প্রদান করা। ক্রাফটসম্যান প্রকৃতপক্ষে লোকসানে আছে। কোনোভাবেই লাভে নেই।

বিএসইসি’র মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যার যদি কোনো অনিয়ম করে থাকে সেক্ষেত্রে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ, ইস্যু ম্যানেজার ও অডিটর উত্তর দেবে। এখানে কমিশনের কোনো মন্তব্য নেই।

উল্লেখ্য, কোম্পানিটির সাবস্ক্রিপশন শুরু হবে আগামী ২১ এপ্রিল থেকে। যা শেষ হবে ২৫ এপ্রিল। ৫০ লাখ শেয়ার ছেড়ে আপাতত ৫ কোটি টাকা উত্তোলন করবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2023 ajkerpujibazar.com
Design & Developed by BD IT HOST