আজকের পুঁজিবাজার:নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ব্যাংকের বিনিয়োগ
* পরিচয় গোপন রেখে নিজের ছোট ভাইকে ব্যাংকের কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়া
* ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনৈতিক চর্চা
* চেয়ারম্যানের বয়সসীমা নীতিমালার লঙ্ঘন
রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাছের বখতিয়ার আহমেদের বিরুদ্ধে স্বার্থের দ্বন্দ্ব, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ব্যাংকের বিনিয়োগ, পরিচয় গোপন রেখে নিজের ছোট ভাইকে ব্যাংকের কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়া, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনৈতিক চর্চার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে, ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদের বয়সসীমা নীতিমালার লঙ্ঘন করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ: অগ্রণী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ফিনেক্সেল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের
শেয়ার কিনেছে অগ্রণী ব্যাংক। এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে আছেন অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাছের বখতিয়ার আহমেদ। উক্ত প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে অগ্রণী ব্যাংকের বিনিয়োগ রয়েছে ৪০ লাখ টাকা। এখানে ৪০ হাজার শেয়ার রয়েছে। এগুলোর ক্রয়মূল্য ছিল প্রতি শেয়ার ১০ টাকা। আর বর্তমানে প্রতি শেয়ারের মূল্য ৬.৩৬ টাকা। এতে বর্তমানে ব্যাংকের লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
অগ্রণী ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, এটি চেয়ারম্যানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। তিনি নিজ স্বার্থের জন্যই এই প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতে ব্যাংককে বাধ্য করেছেন। আবার এই প্রতিষ্ঠানে অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বনামধন্য অনেক প্রতিষ্ঠান থাকতে অখ্যাত প্রতিষ্ঠানে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে ব্যক্তিগত লাভের চেষ্টা করেছেন তিনি।
ভাইকে ব্যাংকের কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়া: জানা গেছে, অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি দেশের ২০০টিরও বেশি শাখায় ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করতে ব্রাক নেট লিমিটেডের সাথে একটি তথ্যপ্রযুক্তি সেবা চুক্তি সম্পাদন করেছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে, কারণ ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাছের বখতিয়ার আহমেদ-এর ভাই সৈয়দ পি এফ আহমেদ ব্র্যাক নেটের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার (সিইও)। তবে এই আত্মীয়তার সম্পর্ক কোনো পক্ষই প্রকাশ করেনি।
এছাড়া, ব্র্যাক নেট ও এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিজেই সমস্যাগ্রস্ত। নিজের ছোট ভাইয়ের প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এটিকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলেও দাবি করছেন কর্মকর্তারা। আর ব্যাংকাররা বলছেন, নিজের প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কেনা ও ছোট ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া স্পষ্ট স্বার্থের দ্বন্দ্ব। এখানে ব্যাংকের চেয়ে তিনি তার ভাইয়ের স্বার্থকে আগে দেখেছেন।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনৈতিক চর্চা: বিধি মোতাবেক চেয়ারম্যান ব্যাংকের খরচে ১টি গাড়ি ব্যবহার করতে পারেন। সৈয়দ আবু নাছের বখতিয়ার আহমেদ বিধি লঙ্ঘন করে ব্যাংকের দুটি গাড়ি ব্যবহার করেন-একটি নিজের জন্য ও অন্যটি পরিবারের জন্য। এই চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তার ভাইকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার সুবিধার্থে ব্যাংকের আইটি ডিভিশনকে ভাগ করে 'আইটি (বিজনেস)' নামে নতুন বিভাগ খুলেন এবং আইটি সংক্রান্ত পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই তার আজ্ঞাবহ একজন মহাব্যবস্থাপককে সেখানে দায়িত্ব দেন।
চেয়ারম্যানের বয়সসীমা নীতিমালার লঙ্ঘন: অগ্রণী ব্যাংকের অন্দরমহলে এখন সবচেয়ে মুখরোচক
আলোচনা-চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাছের বখতিয়ার আহমেদের 'চিরযৌবনা' বয়স! বাংলাদেশ ব্যাংকের স্পষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা পরিচালকদের জন্য সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারিত থাকলেও, এই ক্ষমতাধর চেয়ারম্যানের ক্ষেত্রে নিয়মের যেন কোনো বালাই-ই নেই। ব্যাংক পাড়ায় গুঞ্জন, শীর্ষ চেয়ারটি ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়া নির্দেশনাকে স্রেফ বুড়ো আঙুল দেখিয়েছেন তিনি। সাধারণ কর্মকর্তাদের অবসরের ক্ষেত্রে এক দিনও ছাড় না মিললেও, খোদ চেয়ারম্যানের এই প্রকাশ্য অনিয়ম রহস্যজনক কোন কারণে এড়িয়ে গেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
দেশের প্রচলিত ব্যাংকিং বিধিমালা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ পদ থেকে এমন আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ্যে আসলেও অর্থ মন্ত্রণালয় বা বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ বা তদন্ত কমিটি গঠন করেনি। ব্যাংক খাতের সুশাসন এবং জনস্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রের এই দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর এমন দীর্ঘমেয়াদী নিষ্ক্রিয়তা ও রহস্যজনক উদাসীনতাকেই চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী হাইকোর্ট বিভাগে এই জনস্বার্থমূলক মামলা দায়ের করেছেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা এসব গুরুতর অভিযোগ পুরো ব্যাংকিং খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও সুশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আদালত যদি এই রিট আবেদনটি আমলে নিয়ে রুল জারি করে কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়, তবে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, আইনি সমতা এবং আর্থিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
www.ajkerpujibazar.com
কপিরাইট © আজকের পুঁজিবাজার ২০২৩-২০২৫ সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত