আজকের পুঁজিবাজার:আওয়ামী স্বৈরশাসন একে একে রাষ্ট্র ব্যবস্থাগুলোকে যে একদম কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো ব্যাংকিং খাত। অন্য অনেক খাতের লুটতরাজ নানাভাবে ধামাচাপা দেয়া গেলেও ব্যাংকিং খাতে সীমাহীন দুর্নীতির কারণে যে ব্যাপক আস্থাহীনতা তৈরী হয়েছিল তা স্পষ্টতই দৃশ্যমান ছিল। বেসরকারি খাতে পুরো ব্যাংক কর্পোরেট হাইজ্যাকিং-এর সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়েছিল গুটিকয়েক গোষ্ঠীর হাতে, আর সরকারি ব্যাংকগুলো হয়ে উঠেছিল গণ-লুটতরাজের অভয়ারণ্য। সরকারি ব্যাংকগুলোতে নির্বিচারে শোষণের হাতিয়ার ছিল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ- নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ব্যাংকের বোর্ডে যোগ্য লোকের বদলে দলীয় লোক বসানো হয়েছে, স্বেচ্ছাচারিতা আর স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিদের ব্যাংকের পরিচালক থেকে শুরু করে চেয়ারম্যান পর্যন্ত করা হয়েছে।
জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যাংকিং খাত রিফর্ম করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন সংকটে থাকা পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূতকরণ, পরিচালনা পর্ষদে নিয়োগের নীতিমালা সংস্কার ইত্যাদি। কিন্তু একই রয়ে গেছে দেশের অর্থনীতির প্রধান চালক এই ব্যাংক খাত।
এমতাবস্থায়, নতুন সরকারের সামনে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু, এখানে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। ইতিমধ্যে ব্যাংকিং পাড়ায় সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে অনেক আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৮ সালে যেখানে মোট খেলাপি ঋণ প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা ছিল, সেখানে সাম্প্রতিক সময়ে তা ১ লক্ষ ৬০ হাজার কোটি টাকার পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা খাতের সম্পদমান ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বড় কর্পোরেট ঋণ রিসিডিউলিং ও পুনঃতফসিলীকরণের অপব্যবহার প্রায় সবগুলো ব্যাংকেই এই চর্চা সমান তালে চলছেই। জুলাই বিপ্লবের পর থেকেই প্রবাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়লে রিজার্ভ কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে ব্যাংকের মোট আমানতের হার কমেছে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমেছে এবং খেলাপি ঋণ অনেক বেড়ে গেছে।
পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, এসবের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ—ব্যাংকসমূহে যোগ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা চেয়ারম্যান না থাকা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান দলীয় বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ায় তারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে, আনুগত্য প্রদর্শন করতে গিয়ে কিংবা স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে দুর্বল ঋণ দিয়ে থাকে। ফলে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের আস্থার মূল ভিত্তি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে বারবার মূলধন ঘাটতি পূরণে সরকারি তহবিল ঢালতে হয়েছে। এর অর্থ হলো—অবশেষে জনগণের করের অর্থ দিয়েই ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে।
Bank Company Act, 1991 অনুযায়ী পরিচালক ও চেয়ারম্যান নিয়োগে ফিট অ্যান্ড প্রপার মানদণ্ড অনুসরণ বাধ্যতামূলক। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপনেও বয়সসীমা ও যোগ্যতার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই নীতিমালা প্রয়োগে প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি ও বিলম্বের অভিযোগ উঠেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (FID) ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর ৫৩.০০.০০০০.৩১১.১১.০০২.২০-৪৭ নম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করে। উক্ত প্রজ্ঞাপনের ৪(গ) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির বয়স ৭৫ বছর অতিক্রম করলে তিনি ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা পরিচালক হিসেবে নিয়োগের জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে জানা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি ও রূপালী ব্যাংক পিএলসি–এর চেয়ারম্যানদের বয়স নির্ধারিত সীমার ওপরে যাওয়ার পরও তাঁরা দায়িত্বে বহাল রয়েছেন।
এ বিষয়ে ব্যাংকিং খাতের কয়েকজন বিশ্লেষক বলেন, বিষয়টি ব্যক্তিগত যোগ্যতার নয়; বরং প্রশাসনিক সমন্বয় ও নীতিমালা বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত। নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ব্যাংক বোর্ডের মধ্যে এই সমন্বয়হীনতা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং খাতের পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
করপোরেট গভর্নেন্সের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাংকের বোর্ডের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তির আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা পুরো প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা ও নৈতিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং মানদণ্ড অনুযায়ী, বোর্ড গঠনে স্বচ্ছতা এবং নির্ধারিত যোগ্যতা মানদণ্ড অনুসরণ করা প্রতিষ্ঠানের ‘Fiduciary Duty’ বা আমানতকারীর প্রতি দায়বদ্ধতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। দীর্ঘ ফ্যাসিজম ও লুটপাট শেষে যেখানে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা আনার কথা, সেখানে খোদ অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন লঙ্ঘন করে চেয়ারম্যানদের স্বপদে আসীন থাকা একটি পদ্ধতিগত ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
ব্যাংক জনগণের কাছে একটি আস্থার জায়গা এবং সেই আস্থা টিকিয়ে রাখতে আইনের সুষ্ঠু তদারকি, নীতিমালার ধারাবাহিক প্রয়োগ এবং নেতৃত্ব পর্যায়ে পেশাদার মানদণ্ড নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বহুল প্রত্যাশার এই সরকারের নতুন অর্থমন্ত্রী নিজেও দেশের আরেকটি ক্রান্তিকালে প্রধান রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের পর্ষদে ছিলেন; ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট অনেকেই আশাবাদ ব্যক্ত করছেন যে তিনি সরকারি ব্যাংকগুলোতে ডাইনামিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে এনে তারল্য প্রবাহ নিশ্চিত করবেন।
www.ajkerpujibazar.com
কপিরাইট © আজকের পুঁজিবাজার ২০২৩-২০২৫ সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত